ঢাকা ০৩:৫২ পূর্বাহ্ন, শুক্রবার, ১৬ জানুয়ারী ২০২৬, ২ মাঘ ১৪৩২ বঙ্গাব্দ

ইসলামের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রচিন্তা ও অমুসলিমদের প্রতি বার্তা ।। সাব্বীর আহমাদ

  • প্রকাশঃ ০২:৫৩:৪৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৫
  • ৩৩৭ জন দেখেছেন

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা, যা কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিস্তৃত দিকনির্দেশনাও প্রদান করে। ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তার মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং মানবজাতির কল্যাণ সাধন। এই রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে অমুসলিম নাগরিকদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়ে ইসলাম স্পষ্ট বার্তা দেয়, যা ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

​ইসলামে রাষ্ট্রচিন্তার মূলনীতি:

​১. আল্লাহর সার্বভৌমত্ব (তাওহিদ): ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রীয় ধারণা হলো এই যে, সকল ক্ষমতার উৎস হলেন মহান আল্লাহ। রাষ্ট্র পরিচালিত হবে আল্লাহর নির্দেশিত বিধান, অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে। রাষ্ট্রপ্রধান বা শাসক আল্লাহর প্রতিনিধি (খলিফা) হিসেবে আমানতদারী ও জবাবদিহিতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।

​২. ন্যায়বিচার ও সমতা (আদল): ইসলামী রাষ্ট্রের অপরিহার্য লক্ষ্য হলো সর্বস্তরে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। শাসক, ধনী-দরিদ্র, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা ইসলামের মৌলিক নীতি। কুরআন ও হাদিসে বারবার ন্যায়বিচারের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

​৩. পরামর্শ ও ঐকমত্য (শুরা): রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শাসককে যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করতে উৎসাহিত করা হয়। পরামর্শের মাধ্যমে ঐকমত্যে পৌঁছানোর এই প্রক্রিয়াটি ইসলামের রাষ্ট্রচিন্তায় গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতিফলন ঘটায়।

​৪. জনগণের কল্যাণ (মাসলাহা): ইসলামী রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ নিশ্চিত করা। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা শাসকের অন্যতম কর্তব্য।


ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিম নাগরিকরা বিশেষ মর্যাদা ও অধিকার ভোগ করবেন।
অমুসলিমদের প্রতি ইসলামের বার্তা অত্যন্ত উদার, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক:
​১. ধর্মীয় স্বাধীনতা ও উপাসনার অধিকার:
ইসলাম ধর্ম গ্রহণে কোনো প্রকার জবরদস্তি বা জোর-জুলুমকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “দ্বীন সম্বন্ধে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই” (সূরা বাকারা: ২৫৬)। অমুসলিমরা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও রীতিনীতি অনুযায়ী স্বাধীনভাবে ধর্মপালন করতে পারে এবং তাদের উপাসনালয়সমূহ সুরক্ষিত থাকবে। ঐতিহাসিক ‘মদিনা সনদ’ ছিল এর প্রথম বাস্তব উদাহরণ।

​২. জান-মালের নিরাপত্তা:
ইসলামী রাষ্ট্র অমুসলিম নাগরিকদের জান-মাল ও সম্মানের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। নবী মুহাম্মদ (সা.) কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন যে, “যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করল, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না” (সহিহ বুখারি)। তাদের সম্পদ ও ব্যবসার স্বাধীনতাও সুরক্ষিত।

​৩. ন্যায়বিচার ও সম-অধিকার:
ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ করা হয় না। অমুসলিমদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার অন্যায় বা জুলুম ইসলামে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন, “যারা তোমাদের সাথে ধর্মের ব্যাপারে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের বাড়ি-ঘর থেকে বহিষ্কার করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ করতে ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন” (সূরা মুমতাহিনা: ৮)।

​৪. সামাজিক ও মানবিক সহযোগিতা:
বিপদ-আপদ বা অর্থনৈতিক দুর্বলতার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মতোই অমুসলিম দরিদ্র ও অসহায় ব্যক্তিরা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সহযোগিতা লাভ করবে। হযরত উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে অমুসলিম দরিদ্রদের বায়তুল মাল (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) থেকে সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা ছিল। অমুসলিম প্রতিবেশীর প্রতি সদ্ব্যবহার, তাদের সাথে কুশল বিনিময় ও মানবিক সম্পর্ক বজায় রাখার নির্দেশও ইসলাম দিয়েছে।

ইসলামের রাষ্ট্রচিন্তা কেবল একটি রাজনৈতিক মডেল নয়, বরং এটি ন্যায়বিচার, মানবতা ও সহাবস্থানের এক সমুন্নত দর্শন। অমুসলিমদের প্রতি ইসলামের এই উদার ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে যে, ইসলাম একটি সর্বজনীন ধর্ম, যা সকল মানুষের জন্য শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। ইসলামী রাষ্ট্র সকল নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি সমানভাবে যত্নশীল থাকবে – এটাই ইসলামের চিরন্তন বার্তা।

ট্যাগ
<script async src="https://pagead2.googlesyndication.com/pagead/js/adsbygoogle.js?client=ca-pub-2680215667423951"
     crossorigin="anonymous"></script>

মিথ্যা মামলা থেকে অব্যাহতি পেলেন ডাঃ সানজিদা তাবাসসুম স্বর্ণা

ইসলামের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রচিন্তা ও অমুসলিমদের প্রতি বার্তা ।। সাব্বীর আহমাদ

প্রকাশঃ ০২:৫৩:৪৬ পূর্বাহ্ন, সোমবার, ১৩ অক্টোবর ২০২৫

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা, যা কেবল ব্যক্তিগত ইবাদত ও নৈতিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং একটি সমাজ ও রাষ্ট্র পরিচালনার বিস্তৃত দিকনির্দেশনাও প্রদান করে। ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তার মূল ভিত্তি হলো আল্লাহর সার্বভৌমত্ব, ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা এবং মানবজাতির কল্যাণ সাধন। এই রাষ্ট্রীয় কাঠামোতে অমুসলিম নাগরিকদের অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করার বিষয়ে ইসলাম স্পষ্ট বার্তা দেয়, যা ইতিহাসে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।

​ইসলামে রাষ্ট্রচিন্তার মূলনীতি:

​১. আল্লাহর সার্বভৌমত্ব (তাওহিদ): ইসলামী রাষ্ট্রচিন্তার কেন্দ্রীয় ধারণা হলো এই যে, সকল ক্ষমতার উৎস হলেন মহান আল্লাহ। রাষ্ট্র পরিচালিত হবে আল্লাহর নির্দেশিত বিধান, অর্থাৎ কুরআন ও সুন্নাহর ভিত্তিতে। রাষ্ট্রপ্রধান বা শাসক আল্লাহর প্রতিনিধি (খলিফা) হিসেবে আমানতদারী ও জবাবদিহিতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেন।

​২. ন্যায়বিচার ও সমতা (আদল): ইসলামী রাষ্ট্রের অপরিহার্য লক্ষ্য হলো সর্বস্তরে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। শাসক, ধনী-দরিদ্র, মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে সকলের জন্য ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা ইসলামের মৌলিক নীতি। কুরআন ও হাদিসে বারবার ন্যায়বিচারের প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

​৩. পরামর্শ ও ঐকমত্য (শুরা): রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে শাসককে যোগ্য ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের সাথে পরামর্শ করতে উৎসাহিত করা হয়। পরামর্শের মাধ্যমে ঐকমত্যে পৌঁছানোর এই প্রক্রিয়াটি ইসলামের রাষ্ট্রচিন্তায় গণতান্ত্রিক চেতনার প্রতিফলন ঘটায়।

​৪. জনগণের কল্যাণ (মাসলাহা): ইসলামী রাষ্ট্রের মূল উদ্দেশ্য হলো জনগণের ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ নিশ্চিত করা। অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও মৌলিক অধিকার নিশ্চিত করা শাসকের অন্যতম কর্তব্য।


ইসলামী রাষ্ট্রে বসবাসকারী অমুসলিম নাগরিকরা বিশেষ মর্যাদা ও অধিকার ভোগ করবেন।
অমুসলিমদের প্রতি ইসলামের বার্তা অত্যন্ত উদার, মানবিক ও ন্যায়ভিত্তিক:
​১. ধর্মীয় স্বাধীনতা ও উপাসনার অধিকার:
ইসলাম ধর্ম গ্রহণে কোনো প্রকার জবরদস্তি বা জোর-জুলুমকে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ করেছে। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “দ্বীন সম্বন্ধে কোনো জোর-জবরদস্তি নেই” (সূরা বাকারা: ২৫৬)। অমুসলিমরা তাদের ধর্মীয় বিশ্বাস ও রীতিনীতি অনুযায়ী স্বাধীনভাবে ধর্মপালন করতে পারে এবং তাদের উপাসনালয়সমূহ সুরক্ষিত থাকবে। ঐতিহাসিক ‘মদিনা সনদ’ ছিল এর প্রথম বাস্তব উদাহরণ।

​২. জান-মালের নিরাপত্তা:
ইসলামী রাষ্ট্র অমুসলিম নাগরিকদের জান-মাল ও সম্মানের পূর্ণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। নবী মুহাম্মদ (সা.) কঠোরভাবে সতর্ক করেছেন যে, “যে ব্যক্তি কোনো চুক্তিবদ্ধ অমুসলিম নাগরিককে হত্যা করল, সে জান্নাতের ঘ্রাণও পাবে না” (সহিহ বুখারি)। তাদের সম্পদ ও ব্যবসার স্বাধীনতাও সুরক্ষিত।

​৩. ন্যায়বিচার ও সম-অধিকার:
ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে মুসলিম ও অমুসলিমের মধ্যে কোনো ভেদাভেদ করা হয় না। অমুসলিমদের বিরুদ্ধে কোনো প্রকার অন্যায় বা জুলুম ইসলামে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। আল্লাহ বলেন, “যারা তোমাদের সাথে ধর্মের ব্যাপারে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদেরকে তোমাদের বাড়ি-ঘর থেকে বহিষ্কার করেনি, তাদের প্রতি সদাচরণ করতে ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। নিশ্চয় আল্লাহ ন্যায়পরায়ণদের ভালোবাসেন” (সূরা মুমতাহিনা: ৮)।

​৪. সামাজিক ও মানবিক সহযোগিতা:
বিপদ-আপদ বা অর্থনৈতিক দুর্বলতার ক্ষেত্রে মুসলিমদের মতোই অমুসলিম দরিদ্র ও অসহায় ব্যক্তিরা রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সহযোগিতা লাভ করবে। হযরত উমর (রা.)-এর খেলাফতকালে অমুসলিম দরিদ্রদের বায়তুল মাল (রাষ্ট্রীয় কোষাগার) থেকে সহায়তা প্রদানের ব্যবস্থা ছিল। অমুসলিম প্রতিবেশীর প্রতি সদ্ব্যবহার, তাদের সাথে কুশল বিনিময় ও মানবিক সম্পর্ক বজায় রাখার নির্দেশও ইসলাম দিয়েছে।

ইসলামের রাষ্ট্রচিন্তা কেবল একটি রাজনৈতিক মডেল নয়, বরং এটি ন্যায়বিচার, মানবতা ও সহাবস্থানের এক সমুন্নত দর্শন। অমুসলিমদের প্রতি ইসলামের এই উদার ও মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি প্রমাণ করে যে, ইসলাম একটি সর্বজনীন ধর্ম, যা সকল মানুষের জন্য শান্তি ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। ইসলামী রাষ্ট্র সকল নাগরিকের অধিকার ও মর্যাদার প্রতি সমানভাবে যত্নশীল থাকবে – এটাই ইসলামের চিরন্তন বার্তা।